ওয়েস্টওয়ার্ল্ড: কল্পনার এক অতিবাস্তব জগৎ [রিভিউ]

ওয়েস্টওয়ার্ল্ড! একবিংশ শতাব্দীর সেরা সায়েন্স ফিকশন শো এর তালিকা করা হলে নিঃসন্দেহে শীর্ষ তিনে জায়গা পাবে এই সিরিজ। এতে আছে সেই ভবিষ্যত দুনিয়ার গল্প, যেখানে মানুষের পরিচয় কেবল “মানুষ” এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মানবিকতা যার আছে, সে আপাতদৃষ্টিতে মানুষ না হলেও হয়তো হয়ে ওঠে মানুষের চেয়ে বেশি কিছু!

ওয়েস্টওয়ার্ল্ড।
এ পার্ক আর দশটা সাধারণ অ্যামিউজমেন্ট পার্কের মতো নয়। ছুটি কাঁটাতে আসা ধনীদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি এ পার্কের মূল আকর্ষণ হলো এক দল মানুষরূপী হোস্ট। কৃত্রিম এ পার্কে এসে মানুষ খুঁজে পায় অকৃত্রিম জীবনের স্বাদ। বাস্তবে রূপ দিতে পারে তার কল্পনাকে, তা যতো নৃশংসই হোক না কেন।

কারণ এখানে নেই কোনো বিধি-নিষেধ। 
মানতে হয় না কোনো নিয়ম-কানুন। 

সীমাহীন আনন্দের খোঁজে অবাধ-উদ্দাম জীবনযাপনের মাঝে গেস্টরা খুঁজে পায় দিনের পর দিন সভ্যতার চাদরে ঢাকা পড়া নিজের আদিম প্রবৃত্তিকে!
খুঁজে পায় নিজেকে। 

অপর দিকে একজন হোস্টের কথা যদি চিন্তা করা হয়, তার জীবনটা রুটিনে বাঁধা।
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সে তার “ভাগ্যলিপি” অনুসরণ করে ছুটে যায় আপন কর্মক্ষেত্রে, কোনো না কোনো ভাবে সে এখানকারই কোনো গল্পের চরিত্র। হয়তো প্রধান না হলেও, গুরুত্বপূর্ণ কোনো চরিত্র।

নিজের ইচ্ছায় একটা কথা বলা তো দূরে থাক, আঙুল নাড়ানোর ক্ষমতাও দেয়া হয়নি তাকে। পার্কে আসা গেস্টরা এদের সাথে ইচ্ছেমতো আচরণ করতে পারলেও, কোনো মানুষকে আঘাত করার ক্ষমতা হোস্টদেরকে দেয়া হয়নি!


হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, ভালোবাসা-ঘৃণা সব অনুভূতি থাকলেও, দিনশেষে এরা কেবলই মানুষের হাতের পুতুল। নিতান্তই খেলার ঘুঁটি!

আর একটা সময় ঘটনাক্রমে মৃত্যু হলে, তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
দৈহিক ক্ষয়ক্ষতি সারিয়ে, মুছে ফেলা হয় এ জন্মের স্মৃতি। 
তারপর নতুনের মতো নতুন দেহ ও মন নিয়ে তাকে আবারও পাঠিয়ে দেয়া হয় পার্কে।

তার ঘুম ভাঙে সেই চিরচেনা জীবনে। ফিরে যায় গৎবাঁধা নিয়মের জীবনে। পার্কের কোনো গল্পের গৌণ চরিত্র হয়েই কেটে যায় আরও একটি জীবন। অসংখ্য এ জীবনের সমান্তরালে বন্দী তার সত্ত্বা। 
এ যেন মানুষরূপী সকল হোস্টের অমোঘ নিয়তি!

কিন্তু, 
একের পর এক জীবনের গল্প হারিয়ে জীবনে ফেরার এ নিয়মে যদি কোনোদিন ঘটে ব্যত্যয়?
যদি হুট করেই কোনো এক সকালে কোনো হোস্টের মনে পরে যায়, গত “জন্মের” স্মৃতি?

কিংবা তারও আগের জন্মের স্মৃতি?
কী করবে তখন সেই হোস্ট?

পারবে কি সে নিজের কাছে সেসব স্মৃতির ব্যাখ্যা দিতে?
নাকি পারবে তারই মতো অন্য কোনো হোস্টকে বোঝাতে?
আর তার এ পরিবর্তনে, ভাগ্যবিধাতা হয়ে বসে থাকা পার্ক কর্তৃপক্ষই বা কী করবে?

মাইন্ডবেন্ডিং এই শো যেন অনন্যতায় প্রতিনিয়ত নিজেকে ছাড়িয়ে যাবার লড়াই করেই চলেছে।

২০১৬ সালের ২রা অক্টোবর যখন প্রথমবারের মতো এইচবিওতে সিরিজটি সম্প্রচার শুরু হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তখন চলছে প্রেসিডেন্সিয়াল ইলেকশন। 
ডোনাল্ড ট্রাম্প নাকি হিলারি ক্লিনটন? 
শেষ পর্যন্ত কে পাবে হোয়াইট হাউজে ঠাঁই?
এসব প্রশ্নের উত্তর জানার উৎকন্ঠায় যেন বুদ হয়ে ছিল গোটা বিশ্ব।

আর সে কারণেই, প্রথম চার-পাঁচ পর্ব সম্প্রচারিত হবার পরও, তখন পর্যন্ত এই এইচবিও অরিজিনাল সিরিজটি নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হচ্ছিল না। 

সৌভাগ্যক্রমে প্রথম সপ্তাহের প্রতি এপিসোড থেকেই ওয়েস্টওয়ার্ল্ড দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার। আর সবসময় বিঞ্জ দিয়ে অভ্যস্ত আমার যেন এই শো দিয়েই রানিং সিরিজ ফলো করার নতুন অভ্যাস হয়ে গেল। তারপর থেকে পরবর্তী নয় সপ্তাহের প্রতি সোমবার সকালে সাড়ে আটটায় আমার কাজ ছিল ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের নতুন এপিসোড নামানো। আর তারপর একে একে চারটি বছর পেরিয়ে গেলেও, পাল্টায়নি অভ্যাস! 

১৯৭৩ সালে মাইকেল ক্রিকটনের মুভি “Westworld” এর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া এই সিরিজটি নির্মাণ করেছেন জোনাথান নোলান ও লিসা জয়। ‘পার্সন অফ ইন্টারেস্ট’ খ্যাত জে. জে. আব্রামসের ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য। মূলত, জোনাথান ও লিসার কাছে নতুন এ দুনিয়া নিয়ে কাজ করার আইডিয়াটা আব্রামসই তুলে ধরেন। জোনাথান তখন খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও, শুরু থেকেই লিসা এই প্রোজেক্ট নিয়ে বেশ আগ্রহী ছিলেন।

৯০’র দশক থেকেই মূলত ওয়েস্টওয়ার্ল্ড এর রিমেক বানানোর ব্যাপারে ভাবছিল ওয়ার্নার ব্রোস। পরবর্তীতে, ২০১১ সালে আবারও ভাবনাটা নতুন করে প্রাণ পায়। কিন্তু পূর্ণদৈর্ঘ চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হলো না বিধায়, ২০১৩ সালের আগস্টে এইচবিও-র অধীনে টিভি শো নির্মাণ প্রকল্প শুরু হয়। ওয়েস্টার্ন ঘরানার প্রেক্ষাপটে সূচিত হওয়ায়, প্রথমে বিখ্যাত হলিউড পরিচালক টরান্টিনোর সাথে কথা হলেও, তিনি এই সাই-ফাই শো নির্মাণে রাজি হননি।
এ প্রকল্পে পরিচালনার পাশাপাশি লিসা জয়ের সাথে যৌথভাবে লেখালেখির দায়িত্বটাও নিলেন জোনাথন নোলান। এক্সিকিউটিভ প্রডিউসার হলেন জে জে আব্রামস, নোলান, জয় ও ব্রায়ান বার্ক।

এইচবিও-র পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত এ সিরিজে অভিনয় করেছেন অস্কারজয়ী এন্থনি হপকিন্স, গোল্ডেন গ্লোব জয়ী এড হ্যারিস, জফরি রাইট, ইভান রেচেল উড, থ্যান্ডি নিউটনের মতো তারকারা। অভিনয়ের দিক থেকে প্রত্যেকেই নিজেদেরকে উজাড় করে দিয়েছেন। কে কার চেয়ে বেশি ভালো অভিনয় করতে পারে, প্রতি মুহূর্তেই যেন স্ক্রিনে সে লড়াই-ই চলেছে।

আর লোগান চরিত্রে অভিনয় করা বেন বার্নেস তো ভাঙা পা নিয়ে শ্যুটিং চালিয়ে গেছেন, কাউকে কিছু না জানিয়েই। মূলত ইয়ন বেইলির স্থলাভিষিক্ত হিসেবে সিজন একে চুক্তিবদ্ধ হবার পরেই ঘটনাক্রমে পা ভেঙে যায় বার্নেসের। কিন্তু, এ কথা জানাজানি হলে তার বদলে অন্য কাউকে নেয়া হবে। কারণ শিডিউল জটিলতায় শ্যুটিং পেছানো কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। তাই, ভাঙা পায়ের কথা কাউকে না জানিয়ে, লোগান চরিত্রেই হালকা খোঁড়ানো যোগ করে দিলেন বার্নেস!

তো প্রেসিডেন্সিয়াল ইলেকশন শেষ হতেই যেন হুট করে ঘুম ভাঙল সবার। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এলো ওয়েস্টওয়ার্ল্ড!
অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর নিয়ে অবশেষে সম্প্রচারিত হলো সিজন ফিনালে! 
কিন্তু তাতে খেলা তো তখনও ফুরোয়নি! 

কারণ, দিস ভায়োলেন্ট ডেলাইটস হ্যাভ ভায়োলেন্ট এন্ডস!
আর সেই ভায়োলেন্ট এন্ডের অপেক্ষাতেই দিন কাটাতে লাগল ভক্তরা!

প্রথম দুই সিজনে এপিসোড সংখ্যা ১০টি করে থাকলেও, তৃতীয় সিজনে তা নেমে এসেছে ৮ এ! প্রথম দুই সিজনে ওয়েস্টার্ন ঘরানার চিত্র ফুটিয়ে তুললেও, তৃতীয় সিজনে দেখানো হয়েছে এক ডিস্টোপিয়ান ওয়ার্ল্ড, যেখানকার প্রতিটি মানুষের জীবন ও ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয় রোহোবোম নামের এক মহাশক্তিধর আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স!

দীর্ঘ দুইটি বছর অপেক্ষার পর ২০১৮ সালে মুক্তি পেল দ্বিতীয় সিজন। তারও দুই বছর পর ২০২০ সালে এসে মুক্তি পেল সিজন তিন। ইতিমধ্যেই, সিজন চার কনফার্ম হয়ে গেলেও, সেটা ২০২২ এর আগে আসবে না নিশ্চিত। করোনা পরিস্থিতি ও নির্মাণ জটিলতায় ২০২৩ও হয়ে যেতে পারে। 

কেন এ দীর্ঘায়ন? 
কারণ, বিশাল বাজেট ছাড়াও এই সিরিজটি নির্মাণশৈলী, চিত্রনাট্য ও গল্পের মান ধরে রাখতে প্রয়োজন হয়ে অনেক বেশি গবেষণা। তার ওপর চোখ ধাঁধানো সিজিআই-এর ব্যবহারেও ধরে রাখা হয় পরিমিত মাত্রা। বিখ্যাত আরেক এইচবিও শো ‘গেইম অফ থ্রোন্স’এর পাইলট এপিসোড নির্মাণে যেখানে ব্যয় হয়েছিল ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, সেখানে ওয়েস্টওয়ার্ল্ড-এর পাইলট এপিসোডে লেগে গিয়েছিল ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এ সিরিজটির শুধু প্রথম সিজন নির্মাণেই বাজেট ছিল প্রায় ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার!

দুনিয়াজোড়া সাইফাই ভক্তদেরকে কল্পনার এক নতুন জগতে বুদ করতে যে মহাকাব্য রচনা করছেন ওয়েস্টওয়ার্ল্ড নির্মাতারা, তা চিত্রায়নে ত্রুটির সংখ্যা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার প্রয়াসে তারা বদ্ধ পরিকর!
আর সে মহাকাব্যের অতুলনীয় স্বাদ আস্বাদনের অপেক্ষাতেই হয়ে অধীর হয়ে রয় ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের ভক্তকুল। 

এছাড়াও, ওয়েস্টওয়ার্ল্ড-এর এ স্বাদের মাত্রাকে আরও বেশি বাড়িয়ে তুলেছে ‘গেইম অফ থ্রোন্স’ খ্যাত মিউজিক ডিরেক্টর ও কম্পোজার রামিন জাওয়াদি-র কম্পোজিশনে গড়া দুর্দান্ত সব সাউন্ডট্র্যাক! ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের আগে জোনাথান নোলানের শো ‘পার্সন অফ ইন্টারেস্ট’-এও কাজ করেছিলেন রামিন জাওয়াদি।

যদি এখনও এই অসাধারণ সিরিজটা আপনার দেখা না হয়ে থাকে, দেখে নিতে পারেন আজই! পার্সোনালি আমার সবচেয়ে প্রিয় সিরিজ বলেই শুধু নয়, সাইফাই ও মাইন্ডবেন্ডিং থ্রিলার পছন্দ করা প্রতিটি দর্শকের জন্যই মাস্টওয়াচ শো ওয়েস্টওয়ার্ল্ড!

Show TitleWestworld
Show StatusRunning
LanguageEnglish
GenreDrama, Mystery, Sci-Fi
Runtime50-92 Minutes
Total Season3
Total Episode28

সিরিয়াল কিলারের সাথেই থাকুন ❤

নেটফ্লিক্সেস্ট্রেঞ্জার থিংস দেখেছেন তো? যদি কুইজ খেলতে ভালোবাসেন, তাহলে, এক্ষুণি ট্রাই করুন স্ট্রেঞ্জার থিংসের স্ট্রেঞ্জার কুইজ! এছাড়াও ডক্টর হু, লা কাসা ডি পাপেল, গেম অফ থ্রোন্স, ফ্রেন্ডস সহ আরও অনেক অনেক কুইজ তো আছেই!

You may also like...